রবিবার, ২০ জুন ২০২১, ০২:৪৯ অপরাহ্ন

অভাবের তাড়নায় কোলের শিশুকে পানিতে ফেলে দিলেন মা!

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • Update Time : শুক্রবার, ২৯ জানুয়ারী, ২০২১

স্বামীর বাড়ি থেকে বিতাড়িত অভাবী এক মা নিজের ও সন্তানের ভরনপোষণ যোগাতে ব্যর্থ হয়ে অভিমানে শেষ পর্যন্ত পনের মাস বয়সী সন্তানকে পানিতে ফেলে দিয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। পানিতে ফেলে দিয়েই মা ওই স্থান থেকে সটকে পড়লেও ডুবে যাওয়ার প্রাক্কালে অবুঝ শিশুর কান্না ও ছটফট শব্দে পথচারী আর এলাকাবাসীর সহায়তায় জীবিত উদ্ধার হয় শিশুটি। শুক্রবার (২৯ জানুয়ারি) সকালে কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার বলদিয়া ইঊনিয়নের কাশিমবাজার এলাকায় এই ঘটনা ঘটে।
স্থানীয়দের সহায়তায় উদ্ধার হওয়া শিশুটি বর্তমানে ওই এলাকার রফিকুল ইসলাম এবং এলিনা দম্পত্তির কাছে সুস্থ অবস্থায় রয়েছে। সন্তানকে পানিতে ফেলে দেওয়া ওই মায়ের নাম জমিলা। বছর খানেক আগে স্বামীর বাড়ি থেকে বিতাড়িত হন হতভাগা জমিলা। তখন থেকে কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের পূর্বকেদার গ্রামের দরিদ্র পিতা জয়নাল মিয়ার বাড়িতে বসবাস করে আসছেন তিনি।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও শিশুটিকে উদ্ধারে অংশ নেওয়া দুলাল হোসেন জানান, সকাল নয়টার দিকে বাড়ি থেকে তিনি ওই পথে বাজারে যাচ্ছিলেন। এসময় সড়কে ব্রিজের উপরে উঠলে এক মহিলাকে পানিতে কিছু ফেলতে দেখেন। পরক্ষণেই ওই মহিলা ( জমিলা) ওই স্থান থেকে পালিয়ে যান। কিছু পড়ার শব্দ শুনে দুলাল হোসেন ব্রিজের নিচে তাকিয়ে দেখেন একটি শিশু পানিতে ডুবন্ত অবস্থায় হাত-পা নাড়াচ্ছে ও কাঁদছে। এ অবস্থায় দুলাল চিৎকার করতে থাকেন। তার চিৎকারে স্থানীয় ফরিদুল ইসলাম এবং একজন পথচারী এগিয়ে আসেন। তারা তিনজন মিলে শিশুটিকে পানি থেকে উদ্ধার করেন।


দুলাল বলেন, ‘ডুবন্ত শিশুটিকে উদ্ধারের পর আগুন জ্বালিয়ে শিশুটিকে উত্তাপ দেই। এসময় ব্রিজর পাশের বাড়ির বাসিন্দা রফিকুল ও এলিনা বেগম দম্পতি শিশুটিকে নিজেদের হেফাজতে নেন এবং পরিচর্যা করেন। বর্তমানে শিশুটি তাদের হেফাজতে রয়েছে।’
নিজ সন্তানকে পানিতে ফেলে দেওয়ার কথা স্বীকার করে জমিলা বেগম স্থানীয় সংবাদকর্মীদের জানান, একবছর আগে দুই মাসের সন্তান জাহিদকে নিয়ে স্বামীর বাড়ি থেকে বিতাড়িত হন তিনি। পরে উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের পূর্বকেদার গ্রামের দরিদ্র পিতা জয়নাল মিয়ার বাড়িতে ফিরে আসেন। দিনমুজুর বাবার সংসারে অভাব অনটন থাকায় নিজের ও সন্তানের ভরণপোষণ নিয়ে প্রায়ই ঝগড়া হচ্ছিল। সন্তানের খাবার যোগার করতে পাচ্ছিলেন না জমিলা। অভাব আর অভিমানে বাধ্য হয়েই সন্তানকে পানিতে ফেলে দেওযার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
জমিলা বেগমের পিতা জয়নাল মিয়া জানান, দুই বছর আগে রংপুরের মডার্ন মোড়ের ভর্ত কবিরাজের ছেলে হাফিজুরের সাথে জমিলার বিয়ে হয় জমিলার। বিয়ের এক বছর পরেই দুই মাসের শিশু সন্তানসহ স্বামী পরিত্যাক্তা হন জমিলা। পরে তার বাড়িতে ফিরে আসেন জমিলা। এর আগে তিন সন্তানসহ বড় মেয়ে জরিনাও তার সংসারে ফিরে এসে মাথার বোঝা হয়ে ছিল। সব মিলিয়ে নয় সদস্যর পরিবারে ভরণপোষন চালানো অসম্ভব হয়ে উঠে জয়নালের। স্বামীর বাড়ি ফেরত দুই মেয়ে আর তাদের সন্তানদের ভরণ পোষণ চালাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন জয়নাল মিয়া।
জয়নাল বলেন, ‘সকালে আমি ও আমার ছেলে মাটি কাটার কাজে বের হয়েছিলাম। পরে লোকজনের কাছে জানতে পারলাম আমার মেয়ে জমিলা তার ছেলে জাহিদকে পানিতে ফেলে দিয়েছে। আমি অভাবী মানুষ। কেমন করি কী করবো বুঝতে পারছি না।’
তবে জমিলার নানি সুফিয়া বেওয়া জানান, তার ভিক্ষাবৃত্তির চাল দিয়ে মাঝেমধ্যে জমিলার সন্তানের খরচ চলতো। জমিলা তার সন্তানের জন্য অনেক নির্যাতন আর কষ্ট সহ্য করেছে। এসব নির্যাতন আর কষ্ট থেকে বাঁচতে নিজ সন্তানকে পানিতে ফেলে দিয়েছে সে।
এদিকে শিশুটিকে হেফাজতে নেওয়া এলিনা বেগম বলেন, ‘শিশুটির প্রয়োজনীয় পরিচর্যা করা হয়েছে। শিশুটিকে তিনি লালন পালন করতে চান।’
ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলদিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোখলেছুর রহমান জানান, মূলত অভাব আর অভিমানে জমিলা তার শিশু সন্তানকে ব্রিজ থেকে পানিতে ফেলে দিয়েছিল বলে জানতে পেরেছি। শিশুটি আপাতত রফিকুল ও এলিনা বেগম দম্পতির কাছে রয়েছে। তাকে তার মায়ের কাছে ফেরত দেয়া হবে।
চেয়ারম্যান বলেন, ‘জমিলা বেগমকে ভিজিএফ কার্ডসহ বিধবা ভাতার সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আশা করি তার আর অভাব থাকবে না। সে তার শিশুকে ঠিকমত লালন পালন করতে পারবে।’
ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দীপক কুমার দেব শর্মা বলেন, ‘বিষয়টি জানার পর আমি স্থানীয় চেয়ারম্যানকে খোঁজ নিয়ে ওই নারী ও তার সন্তানকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছি। প্রয়োজনে ওই নারীকে আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হবে।’
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, ‘ আমি বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখবো। প্রয়োজনে ওই নারীকে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সুবিধা ছাড়াও আর্থিক সহায়তা করা হবে।’

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2020 dainikjonokotha.com
Theme Developed BY ThemesBazar.Com