শনিবার, ১৯ জুন ২০২১, ০৩:০৭ পূর্বাহ্ন

উলিপুরে গৃহবধু হত্যা চেষ্টা; মাস পেরুলেও হয়নি মামলা

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
  • Update Time : মঙ্গলবার, ২ মার্চ, ২০২১

কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের হিজুলী চর পুর্ব সাতভিটা এলাকার মোঃ আবুল কালাম ও মোছাঃ কলিমা বেগম দম্পতির পালিত কন্যা মোছাঃ সুমি বেগম (২৪) কে তার স্বামী ও শ্বশুড় শ্বাশুড়ি পারিবারিক কলহের জেরে নির্জন জায়গায় তুলে নিয়ে গিয়ে প্রানে মেরে ফেলার চেষ্ঠা করে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। হত্যা প্রচেষ্টা ও স্বামীর ২য় বিবাহ এবং সুমির উপর অমানবিক নির্যাতনের ধারাবাহিক বর্ননা লিখিত অভিযোগ আকারে উলিপুর থানায় দেয়ার এক মাস পেরিয়ে গেলেও ভূক্তভোগীদের অভিযোগ তারা কোন প্রকার পুলিশি সেবা সুরক্ষা পাননি।

এ বিষয়ে উলিপুর থানা অফিসার ইনচার্জ ইমতিয়াজ কবীর জানান, বিষয়টি উলিপুর সার্কেল স্যার দেখছেন।

কান্না জড়িত কন্ঠে সুমীর মা উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় এ প্রতিবেদককে বলেন, মেয়ের শ্বশুড় বাড়ীর লোকজন প্রভাবশালী হওয়ায় প্রতিনিয়ত গুম খুন মার পিটের হুমকি ধামকি দিয়ে আসছে। কে বা কাহারা প্রতিনিয়ত মোবাইল ফোনে আইনি প্রক্রিয়ায় না যাওয়ার চাপ প্রয়োগ করে সুমীর পরিবারকে ভীত সন্ত্রস্ত করে তুলেছে। পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে তারা এর সমাধান ও বিচার দাবী করেছেন।

বাদীর লিখিত এজাহার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সুমী বেগম তার স্বামীর দ্বিতীয় বিবাহের বিষয়টি জানতে পেরে প্রতিবাদ করলে তার উপর নেমে আসে নির্যাতন। বাধ্য হয়ে বাবা আবুল কালাম মেয়েকে বাড়ীতে নিয়ে আসেন। বাবা আবুল কালাম স্থানীয় মেম্বার সহ গ্রামবাসীদের কাছে বিচার দাবী করেন। এতে বকুল আহমেদ ও তার পরিবার আরো ক্ষীপ্ত হয়ে ওঠে।

তীরবর্তী চরের নির্জন এলাকায় বাড়ীতে কেউ না থাকার সুযোগে সুমীর স্বামী বকুল আহমেদ, তার মা আকলিমা বেগম ও বাবা মজাহার আলী গত২৪ জানুয়ারী ২০২১খ্রীঃ রোজ রবিবার সন্ধ্যা আনুমানিক ৭ ঘটিকার সময় বাড়ীতে প্রবেশ করে। দুজনের কথাকাটাকাটির এক পর্যায়ে শিশু সন্তান খাদীজা কে বকুলের মা কোলে তুলে নিয়ে বাড়ীর বাইরে চলে যায়। সুমী ঐ অবস্থায় মেয়েকে নিতে শ্বাশুড়ির পিছু নেয়। চর ও নদীর তীরবর্তী এলাকা ঘনবসতিপূর্ণ না হওয়ায় ঘটনাটি সকলের দৃষ্টি সীমানার বাইরে ঘটছিলো বলে সকলেরই ধারনা। বকুল আহমেদ বুল্লু সুযোগ বুঝে স্ত্রী সুমীর গায়ে থাকা চাদর দিয়েই তার মুখ চোখ বেধে পুরো শরীর চাদরে পেচিয়ে কাঁধে তুলে ফাঁকা নির্জন এলাকার দিকে নিয়ে একটি গর্তে ফেলে দেয়। দুজনের ধ্বস্তাধস্তি তে মুখের বাঁধন হালকা হলে সুমী চিৎকার দিয়ে ওঠে। ঘটনাটি কলাকাটা চরের স্থানীয় কমছের আলীর বাড়ীর নিকটবর্তী হওয়ায় তারা মহিলার চিৎকার ও “বাঁচান গো বাঁচান” শব্দে কমছের আলী স্থানীয় লোক জন সহ এগিয়ে যায়। কমছের আলী, মজের উদ্দীন, আছর উদ্দীন সেদিনের ঘটনায় সুমীকে অসুস্থ্য ও ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় উদ্ধার করে প্রথমে পার্শ্ববর্তী মেডিকেল বাজারে তারপর বাড়ীতে নিয়ে আসে। তবে সুমীর অবস্থা ভালো ছিলোনা। স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক বিদ্যুৎ সরকার তার চিকিৎসা করেন।

শিশু কে অপহরন ও সুমীকে প্রাননাশের চেষ্টা, বাড়ীতে অবৈধ জনতা কর্তৃক বেআইনি প্রবেশ করে শারিরীক মারপিট, বিনা অনুমতিতে দ্বিতীয় বিবাহ ও নির্যাতন করে বাড়ী থেকে বের হতে বাধ্য করার অভিযোগ এনে গত ২৫-০২-২০২১ খ্রীঃ নির্যাতিতা সুমীর মা মোছাঃ কলিমা বেগম মেয়ের পক্ষে উলিপুর থানায় একটি লিখিত এজাহার দেন বলে জানান । কলিমা বেগমের ভাষ্যমতে অভিযোগটি এএসআই রুহুল আমীন এর হাতে পরে এবং তিনি পরবর্তীসময় তদন্ত করতে যান এবং স্থানীয় স্বাক্ষী ও ঘটনার স্থান পরিদর্শন করেন।

এ ঘটনায় দীর্ঘসূত্রতার সৃষ্টি হয় এবং অদ্যবধি কলিমা বেগম ও আবুল কালামের মেয়ের হত্যা প্রচেষ্টাকারীদের বিরুদ্ধে থানা পুলিশ কোন আইনি পদক্ষেপ গ্রহন না করায় শিশুসন্তানসহ মেয়েকে নিয়ে তারা চরম বিপর্যয় ও নিরাপত্তাহীনতায় ভূগছে বলে সুমীর পিতা আবুল কালাম জানান।

সরেজমিনে ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, একই ইউনিয়নের হিজুলীর চর জলংগারকুটি গ্রামের মোঃ মজাহার আলীর পুত্র বকুল আহমেদ (২৮) ওরফে বল্লু মিয়ার সাথে মোছাঃ সুমি বেগমের (২৪) পারিবারীক আলোচনার ভিত্তিতে ইসলামী শরিয়াহ ও আইন অনুযায়ী গত ২৬-০৪-২০১৫ খ্রীঃ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। বর বকুল আহমেদ ওরফে বুল্লু কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি ও গৌরিপুর উপজেলায় রাস্তার ঠিকাদারী কাজে নির্মান শ্রমিকের কাজ করতো।

পারিবারীক সূত্রে জানা যায়, বুল্লু বহুবছর থেকে ঐ এলাকায় অবস্থান করে আসায় সে এখন ইট খোয়া বালুর সাব ঠিকাদার ও সরবরাহকারী হিসবে বেশ ভালো ব্যবসা করে আসছেন। বিয়ের দেড় বছরের মধ্যে বকুল তার স্ত্রী সুমি বেগম কে তার কর্মস্থল দাউদকান্দির মলাই বাজারে জনৈক রব মোল্লার বাড়ীতে ও আরো একটি পার্শবর্তী বাড়ীতে ৩ বৎসরের মত একসাথে ঘর-সংসার করে আসছে। বিয়ের পর তাদের কোল জুড়ে পর পর দুইটি ফুটফুটে সন্তান জন্মগ্রহন করলেও তারা বেশীদিন দুনিয়ার আলো বাতাসে মাতৃস্নেহে লালিত হতে পারিনি। নিউমোনিয়ার অকাল মৃত্যুই যেন সুমির সন্তানদের পরিনতি। এর মধ্যেই সুমি তার স্বামীর ভিন্ন রুপ ভিন্ন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অনুভব করে। সে সময় তার কোলে আড়াই বছরের আরো একটি সুন্দর ফুটফুটে কন্যা সন্তান। নতুন আশা ও স্বপ্ন নিয়ে বুকের একমাত্র ধন মেয়ের নাম রেখেছিলো মোছাঃ খাদীজা বেগম। সুমী একসময় সত্যটা উপলব্ধি করতে পারলো যে তার সুখের সংসারে শকুনের দৃষ্টি পরেছে। বাড়ি মালিকের এক আত্মীয়ের মেয়ে নাম সালমা বেগম, সেই মেয়ের সাথে তার স্বামীর অবৈধ সম্পর্ক চলে আসছে। এই ঘটনা থেকে একটু একটু করে শুরু হয় মানসিক ও শারিরীক নির্যাতন। দিন দিন শারিরীক নির্যাতনের মাত্রা বারতে থাকে বলে সুমী বেগম এই প্রতিবেদক কে জানান।

বাবার বসতভিটা সব ব্রহ্মপুত্রে বিলিন, বাবা আবুল কালাম ঢাকা মোহাম্মদপুর এলাকায় সিএনজি চালাতো। অভাব অনটনের সংসার। এদিকে প্রতিনিয়ত লাঞ্চনা, বঞ্চনা, সামান্যতেই মার পিট। সুমী নিরুপায় হয়ে বাবা কে ডেকে পাঠায়। বাবা আবুল কালাম সব শুনে মেয়েকে নিয়ে সরাসরি নিজ বাড়ী উলিপুরের বুড়াবুড়ি তে চলে আসে। সুমীর বাবা পুরো ঘটনার বিচার চায় বুড়াবুড়ি ইউপির ৬ নং ওয়ার্ড সদস্য মোঃ ফেরদৌস আলী সহ স্থানীয় মহতদের কাছে। বকুলের অভিভাবকের সাথে কথা বলে মেম্বার সুমীকে তার শ্বশুড় বাড়ীতে তুলে দেন। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস তার স্বামী সাতদিনের মধ্যেই তার দ্বিতীয় স্ত্রী সালমা বেগম কে নিয়ে বীর দর্পে বাড়ীতে নিয়ে আসে ও স্বামী- স্ত্রীর মত বসবাস করে।

সুমীর অভিযুক্ত স্বামী বকুল আহমেদ ওরফে বুল্লুর বক্তব্য নিতে তার বাড়ীতে যোগাযোগ করে তাকে পাওয়া যায়নি। তার পরিবারের লোকজনও এ বিষয়ে কোন কথা বলতে প্রতিবেদকের সামনে আসেন নি।

বুড়াবুড়ি ইউনিয়ন পরিষদের ৬ নং ওয়ার্ডের মেম্বার ফেরদৌস আলী মুঠোফোনে ঘটনার সব সত্যতা স্বীকার করে বলেন, আমি মিজে মধ্যস্থতা করে সুমী ও তার মা বাবা কে বুঝিয়ে বকুল বুলুর বাড়ীতে রেখে এসেছিলাম। বলা হয়েছিলো কুমিল্লার পরের স্ত্রী বাদ দিয়ে সে আসবে। অথচ সাতদিনের মাথায় দ্বিতীয় বউকে নিয়ে বাড়ীতে চলে আসলো। প্রায় মাস খানেক ছিলো ঐ মেয়ে। এলাকাবাসী সবাই দেখেছে। উল্টো সুমীর উপরও নির্যাতন মার ডাং সবসময় করতো। তাই পুনরায় আমি স্থানীয় মুরুব্বীদের নিয়ে সুমিকে ওর বাবার বাড়ীতে পাঠিয়ে দিয়েছি। তিনি আরও জানান ২৪ জানুযারীর ঘটনাও সত্য। আবুল কালাম তথা সুমীদের বাড়ী থেকে বেশকিছুটা দুরে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের মেডিকেল বাজার নামে একটি বাজার আছে।তার পাশেই বিশাল একটা কোলা। ঐ দিন রাতে মেয়েটির চিৎকারে লোকজন ছুটে আসে ও সুমিকে কোলার কাছের একটি গর্ত থেকে উদ্ধার করে প্রথমে মেডিকেল বাজারে নেয়া হয় তারপর ডাক্তার দেখিয়ে বাড়ীতে পাঠানো হয়। সুমীর বর বকুল কে হাতেনাতে ধরা না গেলেও স্থানীয় অনেকেই তাকে সরে যাওয়ার সময় দেখতে পেয়েছে বলে জানান।

উলিপুর থানা অফিসার ইনচার্জ ইমতিয়াজ কবীর জানান, বাদীর লিখিত অভিযোগ পেয়ে তদন্ত কার্যক্রমে একজন পুলিশ অফিসার কে দায়িত্ব দেয়া হয়। মাননীয় পুলিশ সুপার মহোদয় একই অভিযোগ পেয়ে ঘটনার তদন্ত সহ বিষয়টি দেখার জন্য উলিপুর সার্কেল স্যারকে দায়িত্ব দিয়েছেন। স্যারের নির্দেশনা পেলেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আল হাসান মাহমুদ উলিপুর সার্কেলের সাথে প্রতিবেদক কয়েকবার চেষ্টা করেও বক্তব্য নিতে পারেন নি। অফিস সূত্রে জানা গেছে জেলা পুলিশ কুড়িগ্রামের বার্ষিক ক্রীড়া ও রংপুর রেন্জ ডিআইজির প্রোগ্রাম থাকায় ব্যস্ত ছিলেন।

উল্লেখ্য, এ ঘটনায় বাদী কলিমা বেগম ফেব্রুয়ারী মাসের প্রথম সপ্তাহে পুলিশ সুপার কুড়িগ্রাম বরাবর আরো একটি অভিযোগ দিয়েছে বলে পরবর্তী সময় এই প্রতিবেদক জানতে পারে।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2020 dainikjonokotha.com
Theme Developed BY ThemesBazar.Com