মঙ্গলবার, ২২ জুন ২০২১, ০৬:৫৬ পূর্বাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ:
কুড়িগ্রামে বিএনপি নেতার মৃত্যুতে জেলা বিএনপির শিশু বিষয়ক সম্পাদকের শোকবার্তা পাবনায় নিখোঁজ হওয়া শিশুকে ৩৬ ঘন্টার মধ্যে আশুলিয়া থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ নোয়াখালীতে ১২ মামলার আসামী অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার পঞ্চগড়ে প্রতিবন্ধী ভাতা‘র টাকা মেরে দিলেন ইউপি সদস্য  রৌমারীতে পরকীয়ার জেরে যুবক খুন নওগাঁয় প্রধানমন্ত্রীর উপহার পেয়ে হাসি ফুটলো ৫০২ ভূমিহীন পরিবারের মুখে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী ৪ মাসের অন্তঃসত্ত্বা! বন্ধ করে দেওয়া হবে ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান জমি সহ সুসজ্জিত পাকাঘরে স্থায়ী নিবাস হচ্ছে কুড়িগ্রামের ১১শ ভূমিহীনের গৃহহীন পরিবারের মাঝে জমি ও গৃহ প্রদান কার্যক্রম ভার্চুয়ালে উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী 

কুড়িগ্রামে যে ভাষণ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু

কল্লোল রায়:
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ৪ মার্চ, ২০২১

১৯৭৩ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি। কুড়িগ্রাম কলেজ মাঠে সাজানো হয়েছে বিশাল মঞ্চ। প্রিয় নেতা আসবেন বলে লাখো মানুষের অপেক্ষা। অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে নেতা মঞ্চে উঠে হাত নাড়লেন। উচ্ছ্বসিত লাখো বাঙ্গালী তখনো নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলোনা যে বঙ্গবন্ধু তাদের একেবারেই সামনে! সেদিনের স্মৃতিগুলো এভাবেই বর্ণনা করছিলেন কুড়িগ্রাম জেলার মুক্তিযোদ্ধাদের সাবেক কমান্ডার সিরাজুল ইসলাম টুকু।

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে সম্প্রতি কুড়িগ্রামবাসীর উদ্দেশ্যে দেয়া জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেয়া সেই ভাষণের হুবহু ভাষণ প্রিন্ট ভার্সন উন্মোচন করা হয়। ৪৭ বছর পর উত্তরবঙ্গ জাদুঘর ও কুড়িগ্রাম প্রেসক্লাবের উদ্যোগে প্রেসক্লাবের সৈয়দ শামসুল হক হলরুমে উন্মোচন করা এই ভাষণ নিন্মরুপ:

‘কুড়িগ্রামের ভাই ও বোনেরা,
আমি জানি যে অনেক দূরের থেকে আপনারা কষ্ট করে আছেন।অনেকে দূরদূরান্ত থেকে কালকের থেকে এসে বসে আছেন। দেখতে চান। তাই সামনের দিকে এগিয়ে আসতে চান সেটা আমি বুঝি । আপনাদের কাছে আমার বলার কি আছে, যখন আমি দেখি যে দূরদূরান্ত থেকে আপনারা শুধু আমাকে দেখবার জন্য ছুটে আসেন। ভালোবাসা আপনারা জীবনভর আমাকে দিয়েছেন ভালোবাসার যে কত বড় জিনিস যা জীবনে কেউ পেয়েছে কিনা বা কোন নেতা পেয়েছে কিনা আমার জানা নাই।

কুড়িগ্রামের ভাইয়েরা বোনেরা গত স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় আপনার যে কষ্ট স্বীকার করেছেন, যে অত্যাচার সহ্য করেছেন, যে গ্রামকে গ্রাম পাকিস্তানের বর্বর বাহিনী জ্বালিয়ে দিয়েছিল, তখন এই কুড়িগ্রামের ভাইয়েরাও মানুষের কাজে মিলিয়ে বর্বরতার বিরুদ্ধে আপনারা রুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন। 25 বছর পর্যন্ত পাকিস্তানের বর্বর শাসকরা আমার সোনার বাংলাকে লুট করে শেষ করে দিয়েছে। সম্পদ লুট করেছে অর্থ লুট করেছে আমার যা কিছু ছিল তা লুট করেছিল। তারপরে গত যুদ্ধের সময় আমার সমস্ত জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছে। হ্যাঁ সব নিতে পারে কিন্তু বাংলার মাটি নেবার পারে নাই,সব নিতে পারে কিন্তু বাংলার সোনার মানুষকে ধ্বংস করতে পারে নাই। সব নিতে পারে কিন্তু বাংলা মানুষের আদর্শ ধ্বংস করতে পারে নাই। ইনশাআল্লাহ দেশ যখন স্বাধীন হয়েছে, দেশ যখন মুক্ত হয়েছে, পঙ্গপালের দল কে যখন আমরা শেষ করতে পেরেছি, দুঃখ-কষ্ট আমাদের আছে আমাদের আছে। কারোর কিছুই নাই,জেল থেকে বের হয়ে এসে যখন আমি দেখলাম যে কিছুই নেই,কি করে আমার সাড়ে সাত কোটি লোক বাঁঁচবে,কোথায় কাপুড়, কোথায় তেল, কোথায় খাবার,কোথায় পেট্রোল, কোথায় বীজ,কোথায় আমার মানুষের লাঙ্গল , কোথায় আমাদের মানুষের গরু,যার যেখানে যা আছে সবকিছু শেষ করে দিয়ে গেছে। তবুও মানুষ কে বাচাতে হবে। কি করে আল্লাহ আমাদের বাচিঁয়ে রেখেছে সত্যি আমি বলতে পারি না। বোধ হয় আল্লাহর মেহেরবানী ছিলো তাই কোনোমতে দুমুঠো করে এনে বাংলার গ্রামের মানুষের কাছে পৌছে দিয়েছি। কোটি কোটি টাকার রিলিফ,১০০ কোটি টাকা আমি গ্রামে দিয়েছি। দুঃখ হয় মানুষের চরিত্রের পরিবর্তন হয় নাই।

এখনো একদল লোক আছে যারা গরীব কে লুট করে খায়,রিলিফের মাল চুরি করে খায়,এদের আমি বাংলার মাটি থেকে উৎখাত করতে চাই। ধ্বংস করতে চাই। এরা মানুষ না এরা মানুষের অযোগ্য, এরা পশুর চেয়েও অধম।

মানুষ কে ভালবাসতে হবে,মানুষ কে ভালো না বেসে মানুষের সেবা করা যায় না।। মানুষ কে ভালবাসার মধ্যে কৃপনতা আর স্বার্থ থাকে সে স্বার্থ নিয়ে মানুষ কে ভালবাসা যায় না। আর ভালবাসা পাওয়াও যায় না । আমার দুঃখ হয়, আজও পাকিস্তানি বর্বররা আমার তিন চার লক্ষ বাংলার মানুষ কে আটকায় রেখেছে, তারা ছাড়ছেনা। তারা ত্রিশ লক্ষ লোকের জীবন নিয়েও শান্তি পায় নাই। আমি বার বার অনুরোধ করেছি। আমি বিশ্ব দুনিয়ায় বিবেকের কাছে অনুরোধ করেছি, সমস্ত দুনিয়ার বড় বড় দেশের কাছে অনুরোধ করেছি এবং বলেছি, তোমরা আমার বাংলার মানুষ কে ফেরত বন্দোবস্ত করে দাও, যখন এ-ই যুদ্ধ হয়, যখন আমার বাংলার মানুষ কে হত্যা করে, তখন তোমরা অনেকে দেখেও দেখো নাই। কিন্তু এ-ই সাউথ ইস্ট এশিয়ায়, এ-ই উপমহাদেশে শান্তি বজায় করতে হলে, আমি শান্তিতে বাস করতে চাই।কারো সাথে আমার দুশমনি নাই। যদি আমার গায়ে এসে কেউ পড়ে,যদি কেউ আঘাত করার চেস্টা করে, আমার দেশ এতো ছোট নয়, মানুষ যতটুকু মনে করুক না কেনো আমার দেশের সাড়ে সাত কোটি লোক,আমার দেশ দুনিয়ার অষ্টম বৃহৎ রাষ্ট্র (জনসংখ্যার অনুপাতে) । আমার মানুষ একতাবদ্ধ, আমার দেশ সংগঠিত, আমার দেশ ও দেশের জনসাধারণ যা আমি বলি তাই তারা শুনে।বাংলার মানুষ যে নিয়ে ভুট্টু সাহেব আর খেলার চেষ্টা করোনা।।

আপনাদের কাছে আমি আবেদন করবো, যা আপনারা সত্য পথে চলবেন, ন্যায়ের পথে চলবেন, অন্যায়ের মোকাবেলা করবেন, দেশকে ভালোবাসবেন এবং দেশকে গড়বেন, এবং আপনারা যদি পয়দা করতে পারবেন, তাহলে সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে বাস করতে পারবেন। ভবিষ্যৎ আমরা যারা আছি আমাদের বয়স হয়েছে, আমরা ভোগ করতে না পারি কিন্তু এমন কিছু করে যাই যাতে আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধররা আর মানুষের কাছে হাত পাততে না হয়। ওরা সুখ সাচ্ছন্দ্য বাস করতে পারে। সোনার দেশ, যেনো সোনার বাংলা হয়ে যায়।।
খোদা হাফেজ। জয় বাংলা ।।’

৭১’এর মুক্তিযুদ্ধ সহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিষয়বস্তু নিয়ে উত্তরবঙ্গ যাদুঘর নামে সংগ্রশালা তৈরি করেছেন কুড়িগ্রাম জেলা ও দায়রাজজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর(পিপি) আব্রাহাম লিংকন। ববঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণের তাৎপর্য এখনো আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন,সেই ভাষণটিতে তিনি কুড়িগ্রামবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন। ১৯৭৩ সালের নির্বাচন উপলক্ষে কুড়িগ্রাম সফরের সময় দেয়া সেই ভাষণে তিনি ভোটের কথা উল্লেখ করেন নি। সেই মঞ্চে ৭৩’এর নির্বাচনের তৎকালীন কুড়িগ্রাম মহকুমা এলাকার সকল সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। ভাষণটি বর্তমান প্রজন্মকে উজ্জীবিত করবে বলে বলেও উল্লেখ করেন আব্রাহাম লিংকন। এছাড়াও সবার হাতের কাছে এই ভাষণটি পৌঁছে দেওয়ার জন্য এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2020 dainikjonokotha.com
Theme Developed BY ThemesBazar.Com