মঙ্গলবার, ২৭ জুলাই ২০২১, ০২:৩১ পূর্বাহ্ন

ধর্ষণ ও প্রেক্ষাপট

ডালিয়া আল-মিম
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২০

আমাদের প্রত্যহিক যাপিত জীবনের এক অত্যাধুনিক বিড়ম্বনার নাম ইভটিজিং এবং ধর্ষণ। বর্তমানে দেশের হাজারো সমস্যাকে পেছনে ফেলে এটি এখন প্রধান সামাজিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ভক্ষণশীল মনোভাবাপন্ন ! যৌনবিষয়ক কোন শব্দের প্রকাশ্যে উচ্চারণ অথবা সমালোচনা আমাদেরকে আজও বিচলিত করে ।

যারা ইভটিজিং এর অন্তর্ভূক্ত বিষয় সমূহ সংঘটনের সাথে জড়িত এবং এ সকল বিষয়ের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত তারাই ইভটিজার ।

জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি পরিচালিত গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী আমরা দেখতে পারি, প্রধানত কম বয়সের তরুণ, বাসচালক, রিকশাচালক, রাস্তার দোকানদার এবং কখনও কখনও কর্মজীবী মহিলাদের সুপারভাইজার বা সহকর্মীরা ইভটিজিং এবং ধর্ষনের সাথে সরাসরি জড়িত থাকে।

নারীকে তারা শুধুই ভোগ বিলাসের বস্তু ভাবে। ফলে, শিশু, তরুণী, কাজের বু়য়া, শিক্ষার্থী , শিক্ষিত-অশিক্ষিত সহ নির্বিশেষে সকল বয়স ও শ্রেণিভেদে নারীদেরকে এই জঘন্য নির্যাতনের শিকার হতে হয়।

ধর্ষকেরা সবাই শ্রেণিগতভাবে দিনমজুর, শ্রমিক বা নিম্নশ্রেণির ই হয়ে থাকে না । এক্ষেত্রে সকল শ্রেণীর এবং পেশার পুরুষদের আকাঙ্ক্ষা লক্ষ্য করা যায় । তারা নিজেদের আকাঙ্ক্ষা এবং কিছু সময়ের ভোগ বিলাসিতার জন্য এ ধরনের নিকৃষ্ট কাজ করে থাকে ।

একদিকে দেশের নারীর প্রতি সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত নেতিবাচক। অন্য দিকে, দিন যাচ্ছে আর আইনের প্রতি মানুষ ভরসা কমছে । ধর্ষণ বিষয়টি আমাদের দেশে বর্তমানে এত ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে যে, একে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রতিরোধের ব্যবস্থা এখনই নিশ্চিত করতে হবে । তা না হলে আমাদের সমাজে এর প্রবণতা বাড়তে থাকবে । ধর্ষণ এবং ইভটিজিং জাতীয় যে সকল ক্রাইম হয়ে থাকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ধর্ষণের শিকার নারী যেখানে ধর্ষককে চিহ্নিত করে এবং বিভিন্ন প্রমাণ সহ তথ্য দেওয়ার পরও বিষয়গুলো ধামাচাপা পড়ে যায় ।

আমাদের সচেতনতা বোধ অনেকাংশে পরিবর্তন আনতে পারে।

ধর্ষনের কবলে পড়ে বা কোনো বড় রকমের খুন এবং নির্যাতনের মত ঘটনা ঘটলে এই দেশে মানুষকে রাজপথে যেতে হয়। প্রতিবাদী সুরে স্লোগান দিতে হয় ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ বা ‘বিচার চাই’, ‘বিচার চাই’ বলে সারাদেশ প্রকম্পিত করে তুলতে হয়। এই বিষয় সাক্ষী হয়ে থেকে যায় । ঘটনাগুলো সাক্ষ্য দেয় যে, দিনের পর দিন দেশে অন্যায় এবং দুর্নীতি বেড়েই চলেছে এবং সুবিচার না হওয়ার দৃষ্টান্ত ও রয়েছে। তাই, রাজপথে নেমে মিছিল করে প্রতিবাদী সুরে স্লোগান দিতে হয়। যেন আইনের কঠোর ব্যবস্থা এবং সুবিচার নিশ্চিত করার জন্য পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে আইনের সঠিক ব্যবহারের দিকে নজর দেওয়া হয় । এই বিচার-তরান্বিত করার প্রক্রিয়া এবং আন্দোলনই সাক্ষ্য দেয় যে, এদেশে সুবিচার পাওয়া যেন আকাশের অমাবস্যার চাঁদের মত ।

এমন ভয়ানক নির্যাতন এবং ধর্ষণের হাত থেকে রক্ষা পেতে আপনি কি মেয়েদের হাতে অস্ত্র তুলে নিতে বলবেন ? তাদেরকে বিনামূল্যে অস্ত্র সরবরাহ করবেন? ধর্ষণ হাওয়া নারীকে বৈধভাবে হত্যা করতে বলবেন অথবা সমাজ থেকে বিচলিত করবেন ?

যদি তা না করেন, তাহলে কি নারীদেরকে আবদ্ধ জীবন কাটাতে বলবেন নিজেদের সতর্কতার জন্যই? বাইরে গেলেও একা বাইরে যেনো না যায়, সেই বিষয়ে সতর্ক করবেন?

এই দুই পন্থার কোন টাই স্বাভাবিক নয় । তবে সচেতনতা পারে আমাদের এই ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে । এখন নারীদের সচেতনতার দিকে বিবেচনা করে বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে নানা ধরনের স্প্রে , এরমধ্যে পেপার স্প্রে অন্যতম । আপনি নারীদেরকে এসকল বিষয় সম্পর্কে জানাতে পারেন। তাদেরকে সচেতন করতে পারেন যেন তারা বাইরে যাওয়ার সময় নিজেদের খেয়াল রাখে এবং নিজেরা সচেতন হয় ।

আইনের সুশাসন যদি পুরোপুরি ভাবে নিশ্চিত করা যায় এবং তার সুফল , সুযোগ-সুবিধা যদি সকল নাগরিক সমভাবে পেতে পারে তাহলে স্বাভাবিক অবস্থায় কোনো নাগরিকের ‘ভীত’ ‘সন্ত্রস্ত’ হবার ব্যাপারটি বিরল হয়ে যাবে।

অথবা, বাইরে যেতে হলেই আগে সন্মান এবং আত্মরক্ষার ভাবতে হবে না , নির্দ্বিধায় একজন নারী স্বাধীনভাবে রাস্তায় চলাফেরা করতে পারবে। অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে কোনো দুর্ঘটনা বা অন্যায় ঘটে যাওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে। সুবিচার পাবার আশায় রাজপথে নেমে প্রতিবাদী স্লোগান দিতে হবে না ।

ধর্ষক বা ইভটিজারদের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য নারীদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। আপনার ছেলে সন্তানটি যেনো ধর্ষক মানসিকতার পুরুষে পরিণত না হয় ছোটবেলা থেকেই এ সব বিষয়ের প্রতি নজর দেবেন । সেই জন্য তাকে বোঝান এবং সচেতন করুন। প্রয়োজনে প্রশিক্ষণের আওতায় আনুন। ‘পুরুষালি আচরণ’ রপ্ত করার নামে, পুরুষ ব্যক্তিটি যেনো ‘ মানুষরূপী অমানুষ ‘ ও ‘অপরাধী’তে পরিণত না হয়, তাকে সেই বিষয়ে সতর্ক এবং সচেতন করুন।

নারী এবং পুরুষ উভয়ের মানসিক পরিবর্তন এবং সচেতনতা বৃদ্ধির প্রধান উৎসই হচ্ছে পরিবার । আপনার ছেলে এবং মেয়ে কি ধরনের বন্ধু নির্বাচন করছে সেদিকে নজর দিন ।

আমরা যদি এসকল সামাজিক দুর্নীতি প্রতিরোধে ব্যর্থ হই, তাহলে শুধু আমাদের এই সুন্দর সুস্থ সমাজ বিনির্মাণের প্রচেষ্টাই বিঘ্নিত হবে না । বরং আমাদের জাতীয় উন্নয়নের পরিকল্পনা ও বাধাগ্রস্ত হবে । আইনের সঠিক বাস্তবায়নের ওপর আমাদের জোর দিতে হবে ।

সর্ব মহল থেকে সম্মিলিত কন্ঠে দাবি তুলতে হবে, স্লোগান দিতে হবে প্রতিবাদের ” ধর্ষণ প্রতিরোধ করো, এর বিরুদ্ধে রুখে দাড়াও ! ”

 

লেখাঃ টাঙ্গাইল থেকে ডালিয়া আল-মিম।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2020 dainikjonokotha.com
Theme Developed BY ThemesBazar.Com