বৃহস্পতিবার, ০৫ অগাস্ট ২০২১, ০৬:৪৯ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ:

মহামারির বছরে বিশ্বে ক্ষুধা বৃদ্ধি : জাতিসংঘ

কল্লোল রায়:
  • Update Time : মঙ্গলবার, ১৩ জুলাই, ২০২১

সবচেয়ে বেশি বেড়েছে আফ্রিকায়। সংকটময় মুহূর্তে বিশ্ব, ২০৩০ নাগাদ পরিবর্তন আনতে হলে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।

জাতিসংঘ বলেছে, ২০২০ সালে বৈশ্বিক ক্ষুধা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে, যার বেশিরভাগই সম্ভবত কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত। যদিও মহামারির প্রভাব এখনও পুরোপুরি খতিয়ে দেখা হয়নি। কয়েকটি সংস্থার (মাল্টি-এজেন্সি) এক যৌথ প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, বৈশ্বিক জনসংখ্যার প্রায় ১০ ভাগ বা ৮১ কোটি ১০ লাখ মানুষ গত বছর অপুষ্টিতে ভোগে। সংখ্যাটি এটাই নির্দেশ করছে যে, ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবীকে ক্ষুধামুক্ত করার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হলে বিশ্বকে ব্যাপক প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে।

বিশ্বে খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির অবস্থা শীর্ষক প্রতিবেদনের এই বছরের সংস্করণটি মহামারির যুগে এ জাতীয় প্রথম বৈশ্বিক মূল্যায়ন। যৌথভাবে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের ফুড অ্যান্ড অগ্রিকালচার অরগানাইজেশন (এফএও), ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর অগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট (আইএফএডি), ইউনাইটেড ন্যাশন্স চিলড্রেন্স ফান্ড (ইউনিসেফ), ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম (ডব্লিউএফপি) এবং ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশন (ডব্লিউএইচও)।

এই প্রতিবেদনের আগের সংস্করণগুলো ইতোমধ্যে লাখ লাখ মানুষের – যাদের অনেকেই শিশু – খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকিতে থাকার বিষয়টির প্রতি বিশ্বকে সতর্ক করে। এই বছরের প্রতিবেদনের ভূমিকায় জাতিসংঘের পাঁচ সংস্থার প্রধানরা লিখেছেন, “দুর্ভাগ্যজনকভাবে, মহামারি অব্যাহতভাবে আমাদের খাদ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করে চলেছে, যা বিশ্বজুড়ে মানুষের জীবন ও জীবিকাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।”

কূটনৈতিক গতি বৃদ্ধির বিষয়ে নতুন আশাবাদ ব্যক্ত করলেও তারা একটি “সংকটপূর্ণ মুহূর্ত” সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। তারা লিখেছেন, “এই বছর আসন্ন জাতিসংঘ খাদ্য সম্মেলন, বৃদ্ধির জন্য পুষ্টি বিষয়ক সম্মেলন, এবং জলবায়ু বিষয়ক কপ২৬ সম্মেলন খাদ্য ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির বিষয়টিকে এগিয়ে নেওয়ার অনন্য সুযোগ তৈরি করেছে।” তারা যোগ করেন, “এসব আয়োজনের ফলাফল এগিয়ে নেবে জাতিসংঘের পুষ্টি বিষয়ক কার্যক্রমের দশকের দ্বিতীয়ার্ধকে” – যা এখনও পূরণ না হওয়া নীতিমালা পর্যায়ে একটি বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতি।

ইতোমধ্যে ২০১০ এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে অপরিবর্তনীয় হ্রাসের আশাকে ধুলিস্যাত করে দিয়ে ক্ষুধা পরিস্থিতির অবনতি হতে থাকে। উদ্বেগজনকভাবে, ২০২০ সালে জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে ছাপিয়ে নিরঙ্কুশ এবং আনুপাতিক –- উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষুধা বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছর বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯.৯ শতাংশ অপুষ্টিতে ভুগেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা ২০১৯ সালের ৮.৪ শতাংশের চেয়ে বেশি ছিল।

 

অপুষ্টির শিকার মানুষের অর্ধেকেরও বেশি (৪১ কোটি ৮ লাখ) এশিয়ায় এবং এক-তৃতীয়াংশের বেশি (২৮ কোটি ২০ লাখ) আফ্রিকায় বসবাস করে। আর অপেক্ষাকৃত একটি ছোট অংশ (৬ কোটি) লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে বসবাস করে। তবে ক্ষুধা সবচেয়ে বেশি বেড়েছে আফ্রিকায়, যেখানে মোট জনসংখ্যার প্রায় ২১ শতাংশই অপুষ্টির শিকার, যা অন্য যে কোনো অঞ্চলের তুলনায় দ্বিগুণ।

 

পরিমাপের অন্যান্য সূচকেও ২০২০ সালটি ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন। সামগ্রিকভাবে, ২৩০ কোটিরও বেশি মানুষের (বা বিশ্বের জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ) বছরজুড়ে পর্যাপ্ত খাবারের অভাব ছিল: মাঝারি বা তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার প্রাদুর্ভাব হিসেবে পরিচিত এই সূচকের এক বছরের বৃদ্ধি গত পাঁচ বছরের সম্মিলিত বৃদ্ধির সমান ছিল। লিঙ্গ বৈষম্য গভীরতর হয়েছে: ২০২০ সালে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় থাকা প্রতি ১০ জন পুরুষের বিপরীতে নারীর সংখ্যা ছিল ১১ জন (২০১৯ সালের ১০.৬ থেকে বেশি)।

 

অপুষ্টির সবগুলো ধরনই বিদ্যমান রয়েছে, যেখানে শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। ২০২০ সালে পাঁচ বছরের কমবয়সী প্রায় ১৪ কোটি ৯০ লাখেরও বেশি শিশু ছিল খর্বকায় বা তাদের বয়সের তুলনায় কম উচ্চতাসম্পন্ন; ৪ কোটি ৫০ লাখেরও বেশি শিশু ছিল রোগা বা তাদের উচ্চতার তুলনায় শীর্ণকায়; এবং প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ শিশুর ওজন ছিল নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি। ৩০০ কোটি প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশু স্বাস্থ্যকর খাবার থেকে বঞ্চিত ছিল, যার বড় কারণ খাদ্যদ্রব্যের অতিরিক্ত মূল্য। প্রজনন বয়সী নারীদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ রক্ত স্বল্পতায় ভোগেন। বিশ্বব্যাপী কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতিও হয়েছে, যেমন — অনেক শিশুকে এখন শুধুমাত্র মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো হচ্ছে। তবে তা সত্ত্বেও ২০৩০ সালের মধ্যে পুষ্টির কোনো সূচকে লক্ষ্য অর্জনে বিশ্ব সঠিক পথে নেই।

বিশ্বের অনেক জায়গায় মহামারিটি নির্মম অর্থনৈতিক মন্দার সূত্রপাত ঘটিয়েছে এবং খাদ্য ব্যবস্থাকে এলোমেলো করে দিয়েছে। তবে এমনকি মহামারির আগেও ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছিল; অপুষ্টি নিয়ে অগ্রগতি পিছিয়ে পড়ছিল। সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা বা অন্য অর্থনৈতিক মন্দাপীড়িত অথবা উচ্চ বৈষম্যের — যার সবগুলোকেই এই প্রতিবেদনে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, এবং যা পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত — বিরুদ্ধে লড়তে থাকা দেশগুলোতে এটা বেশি ঘটে।

বিশ্বের খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির অবস্থা শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার দ্বিতীয় লক্ষ্য (২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বকে ক্ষুধামুক্ত করা) পূরণ হবে না এবং প্রায় ৬৬ কোটি মানুষ ক্ষুধার্তই থেকে যাবে। এই ৬৬ কোটির মধ্যে প্রায় ৩ কোটি মহামারির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

এদিকে, পুষ্টির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রশংসনীয় অগ্রগতি অর্জন করেছে। খর্বাকৃতির (স্টান্টিং-এর) প্রবণতা ২০১২-১৩ সালের ৩৬ শতাংশ থেকে ২০১৯-এ ২৮ শতাংশে নেমেছে। তবে বাংলাদেশে এখনো পুষ্টির পরিস্থিতি উদ্বেগজনক রয়েছে। … ২০১৯ অনুসারে, তীব্র শীর্ণকায় হওয়ার (ওয়েস্টিং-এর) প্রবণতা ৯.৮ শতাংশ। খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার অভিজ্ঞতার স্কেল (এফআইইএস) এর উপর ভিত্তি করে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার বিস্তারের জাতীয় অনুমান ৩১.৫ শতাংশ।

কী (এখনও) করা যেতে পারে

গত বছরের প্রতিবেদনে যেমনটা বলা হয়েছিল যে, খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন, পুষ্টির মান উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্যকর খাবার সবার নাগালের মধ্যে রাখার জন্য খাদ্য ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা জরুরি। প্রতিবেদনের এই বছরের সংস্করণটিতে “পরবর্তনের ছয়টি উপায়ের” কথা বলা হয়েছে। লেখকরা বলছেন, এই উপায়গুলো ক্ষুধা ও অপুষ্টির চালিকাশক্তিগুলোকে প্রতিরোধ করতে “নীতিমালা ও বিনিয়োগের পোর্টফোলিওগুলোর সুসংগত সেট”-এর ওপর নির্ভর করে।

 

একটি দেশ নির্দিষ্ট কোন ধরনের চালিকাশক্তির (বা একাধিক চালিকাশক্তি) মুখোমুখি তার ওপর নির্ভর করে প্রতিবেদনে নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে:

 

·        সংঘাতময় স্থানগুলোতে মানবিক, উন্নয়ন এবং শান্তি-প্রতিষ্ঠার নীতিমালাগুলোকে একীভূত করতে – উদাহরণস্বরূপ, সামাজিক সুরক্ষামূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে পরিবারগুলোকে সুরক্ষা দেওয়া যাতে খাদ্যের বিনিময়ে তাদের সামান্য সম্পদ বিক্রি করতে না হয়;

·        খাদ্য ব্যবস্থা জুড়ে জলবায়ু মোকাবিলায় সক্ষমতা জোরদার করতে – উদাহরণস্বরূপ, ক্ষুদ্র চাষীদের জলবায়ু ঝুঁকি বীমা এবং পূর্বাভাস-ভিত্তিক অর্থায়নে অংশগ্রহণের বিস্তৃত সুযোগ প্রদানের মাধ্যমে;

·        প্রতিকূল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে থাকা জনগোষ্ঠী সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে – উদাহরণস্বরূপ, মহামারির মতো ঘটনার ধাক্কা বা খাদ্যমূল্যের ওঠানামার প্রভাব কমাতে নগদ অর্থ বা এই ধরনের সহায়তামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে;

·        পুষ্টিকর খাবারের দাম কমিয়ে আনার জন্য সরবরাহ ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করতে – উদাহরণস্বরূপ, জৈব প্রযুক্তির ব্যবহার করে ফসল উৎপাদনে উৎসাহিত করে বা ফল ও সবজি উৎপাদকদের তাদের পণ্য বাজারে বিক্রি করা সহজ করার মাধ্যমে;

·        দারিদ্র্য এবং কাঠামোগত বৈষম্য সামাল দিতে – উদাহরণস্বরূপ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং প্রত্যায়ন কর্মসূচির মাধ্যমে দরিদ্র কমিউনিটিগুলোতে খাদ্য মান শৃঙ্খল বা ফুড ভ্যালু চেইন জোরদার করার মাধ্যমে;

·        খাদ্য পরিবেশ শক্তিশালী এবং ভোক্তাদের আচরণ পরিবর্তন করতে – উদাহরণস্বরূপ, খাদ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে শিল্পজাত ট্রান্স ফ্যাট বাদ দিয়ে এবং লবণ ও চিনির পরিমাণ কমিয়ে বা খাদ্য বিপণনের নেতিবাচক প্রভাব থেকে শিশুদের রক্ষা করার মাধ্যমে।

পরিবর্তনকে সম্ভব করার জন্য প্রতিবেদনে “প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও সংস্থাগুলোর জন্য সক্ষম কর্মপরিবেশের” ব্যবস্থা করারও আহ্বান জানানো হয়েছে। এটি নীতিনির্ধারকের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে আরও বিস্তৃত পরিসরে পরামর্শ করতে; নারী ও যুবসমাজের ক্ষমতায়ন করতে; এবং উপাত্ত ও নতুন প্রযুক্তির সহজলভ্যতা বিস্তৃত করতে। সর্বোপরি, লেখকরা আবেদন জানিয়ে লিখেছেন, বিশ্বকে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে বা আগামী বছরগুলোতে, তানাহলে মহামারিটির ধাক্কা কেটে যাওয়ার অনেক পরে ক্ষুধা ও অপুষ্টির চালিকাশক্তিগুলোর আরও তীব্রভাবে ফিরে আসা দেখতে হবে।

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2020 dainikjonokotha.com
Theme Developed BY ThemesBazar.Com